নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট নগরীর উত্তর সুরমার কোতোয়ালী থানার একাধিক এলাকায় প্রকাশ্যে চলছে রমরমা জুয়া ও মাদক ব্যবসা। দিনের পর দিন এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও পুলিশের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ—জুয়ার সিন্ডিকেটের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশের দৃশ্যমান সখ্যই এই অপরাধ সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। ঘাসিটুলা, মোকাম বাজার, কানিশাইল, কেয়াঘাট,বাগবাড়ী, রিকাবীবাজার—এই এলাকাগুলো এখন কার্যত শিলং তীর ও জান্ডিমুন্ডু জুয়ার ‘ওপেন জোনে’ পরিণত হয়েছে। এতসব জায়গায় প্রকাশ্যে মোবাইল এপসের মাধ্যমে জুয়া চললেও লামাবাজার ফাঁড়ি পুলিশের নবাগত আইসিকে নরম করেছে বখরার রাজত্ব ?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নবাগত আইসি যোগদান করার পর ঐসব চিহ্নিত জুয়ার আস্তানায় সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করে বেশ কিছু জুয়ারীকে আটক করে জুয়া- মাদক বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষনা করেন। বিশ্বস্থ একটি সুত্র জানায় নবগত আইসি ছোট এমাউন্ট খাননা তিনি বড় এমাউন্ট খেতে ভালো বাসেন। তাহার এই জিরোটলারেন্স নীতি কয়েকদিনের জন্য বাহবা কুড়ালেও হঠাৎ করে পাল্টে যায় সবকিছু। এর মূলে রয়েছে পুলিশের লাইনম্যান হিসেবে পরিচিত উবার চালক রবিউল। সে নবাগত আইসিকে বড় অংকের বখরা দিয়ে ম্যানেজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ব্যপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জুয়ারী এই প্রতিবেদককে বলেন, রবিউলের মাধ্যমে আইসিকে ম্যানেজ করেই চলে অবৈধ জুয়া মাদকের ব্যবসা। পার্থক্য শুধু এটুকু আগে যেখানে ১০ টাকা দেওয়া লাগতো এখন সেখানে ১৫ টাকা দিতে হয়। এসব টাকা কিভাবে দেওয়া হয় এবং কে টাকা নেয় জানতে চাইলে তারা বলেন টাকা প্রতি সপ্তাহে দিতে হয়। পুলিশের টাকা লাইনম্যান রবিউল এসে নিয়ে যায় বলে জানান ঐ জুয়ারী।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক জুয়ারী এই প্রতিবেদককে বলেন আইসি আমিনুল ইসলাম যোগদান করার পর সকল জুয়ারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের ফাঁড়িতে ডেকে নিয়ে বলেন সবাই নিয়মিত সাপ্তাহিক হিসাব ক্লিয়ার করবেন, সমস্যা হলে আইসির নাম্বারে কলদিতে বলেন। টাকা কার কাছে দিবো জানতে চাইলে বলেন আগে যে নিয়েছে এখনো সেই নিবে।
এবিষয়ে জানতে কোতোয়ালি থানাধীন লামাবাজার ফাঁড়ি পুলিশের নবাগত আইসি আমিনুল ইসলাম এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন কারা জুয়ার আস্তানা পরিচালনা করছে এবং পুলিশের নামে টাকা তুলছে তাদের চিনিনা, নাম ঠিকানা দেন আজই ব্যবস্থা নিচ্ছি। রাতে লাইনম্যানদের ডেকে সতর্ক করা হলে, ক্ষোভে বেপরোয়া হয়ে উঠে লাইনম্যান রবিউল। সে কোয়ারপাড় ভিতরের পয়েন্টে হুংকার দিয়ে বলে দেখি কে আমার বাল পালায়!
জুয়ার আস্তানা গুলে হলো:- উত্তর সুরমার ঘাসিটুলা মোকাম বাজারে বড় মসজিদের সামনে সুরমা নদীর পাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে জুয়ারী মুন্নার নেতৃত্বে বেপরোয়া জুয়ার আসর। প্রতিদিন এখানে শিলং তীর ও জান্ডিমুন্ডু নামের জুয়ার মাধ্যমে হাতবদল হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এই জুয়ার বোর্ড পুলিশ দেখেও দেখে না। কারণ উপরের লাইন ঠিক আছে।” তাঁদের ভাষায়, লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির আইসির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদেই মুন্না নির্বিঘ্নে এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি এসব অবৈধ জুয়া ও মাদকের আস্তানা থেকে ফাঁড়ির নামে সপ্তাহে ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা নিয়মিত বখরা আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে আছেন আইসিির লাইনম্যান ও সোর্স রবিউল, স্থানীয়দের প্রশ্ন—যেখানে বখরা আসে নিয়মিত, সেখানে অভিযান আসবে কীভাবে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তর সুরমা ও কোতোয়ালী থানাধীন লামাবাজার ফাঁড়ির আওতায় আরও একাধিক জুয়ার বোর্ড ও মাদক আস্তানা সক্রিয়:—শামিমাবাদ খান সেন্টারের সামনে জুয়ারী আলম, মনিকা সিনেমা হল সংলগ্ন কলোনির ভেতরে জুয়ারী আনু, বাগবাড়ী ব্রিজের পাশে জুয়ারী শিমুল, ঘাসিটুলা মরাটিলা মাদরাসা গলির মুখে জুয়ারী রাসেল, রিকাবীবাজার নূরী রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন গলিতে শিলং তীরের জমজমাট আসর, এছাড়াও জুয়ারী জহির কোয়ারপাড় (হাওর), জুয়ারী আসাদ-সালাম খুলিয়া পাড়া, জুয়ারী মিঠু কোয়ারপাড়, শিপলু মেডিকেলের পিছনে সেঞ্চুরি নামক বোর্ড, জুয়ারী আলম কানিশাইল কেয়াঘাট, শেখঘাট পাসপোর্ট অফিসের বিপরীত দিকে সুরমানদীর পাড়ে জুয়ারী আরিফের বোর্ড চালায় জামাল নামের আরেক জুয়ারী, মদিনা মার্কেট সবজি বাজারে ইদন মিয়া জুয়ার রমরমা ব্যবসা চালায়।
এছাড়া লামাবাজার মদনমোহন কলেজের উত্তরপাশের গলির ভিতর সরষপুরে মাদক ব্যবসায়ী ডুঙ্গা সেলিম সপ্তাহে ৪০০০/ এবং একই এলাকায় আরেক মাদক ব্যবসায়ী শুকুর আলী সপ্তাহে ৫০০০ /টাকা বখরা দেয় বলে জানা যায়। এতগুলো স্পটে জুয়া ও মাদক ব্যবসা চললেও তা কি প্রশাসনের অজানা থাকতে পারে? অবশ্যই না!
শুধু জুয়াই নয়—এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঘাসিটুলা ও কানিশাইল এলাকায় জসিম নামের এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে ইয়াবা ব্যবসা চালাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি লামাবাজার ফাঁড়ির নামে প্রতিদিন ১০০০/ টাকা করে ‘ম্যানেজ’ দেওয়া হচ্ছে। ফলে মাদকের বিরুদ্ধেও নেই কার্যকর অভিযান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, “আমাদের এলাকা এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যুব সমাজ ধ্বংস হচ্ছে, আর পুলিশ বখরার হিসাব মেলাচ্ছে।” তাঁরা অবিলম্বে— এসএমপি কমিশনারের সরাসরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট নাম, নির্দিষ্ট অঙ্ক—সবকিছু প্রকাশ্যে উঠে আসার পরও যদি জুয়ার বোর্ড বন্ধ না হয়, তাহলে প্রশ্ন একটাই—আইন কি এখানে কার্যকর, নাকি বখরার টাকায় আইন নিজেই জিম্মি? এই প্রশ্নের জবাব এখন সিলেট মহানগর পুলিশের কাছেই প্রত্যাশা করছে নগরবাসী।