নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিলেটের কৃষিপণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় সম্ভাবনাময় এই বাজারের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় সিলেটের কৃষিপণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিতে প্যাকিং হাউস কাম কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সিলেট থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে সিলেটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটে উৎপাদিত বেশ কয়েকটি কৃষিপণ্যের ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে গোয়ালগাদ্দা শিম, সাতকড়া, জাড়ালেবু, কচুর লতি, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। তবে সিলেটে প্যাকিং হাউসসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণে ব্যয় বাড়ছে। এতে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবজি রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৮৮ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বের ২২টি কৃষিপণ্যের শীর্ষ উৎপাদক দেশের তালিকায় বাংলাদেশ থাকলেও গত অর্থবছরে কৃষিপণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় এক শতাংশেরও বেশি কমেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সিলেটে প্যাকিং হাউস কাম কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। এতে কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন এবং কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সিলেটের কৃষিপণ্যের প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপ-পরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে কৃষকরা তাদের পণ্যের ভালো দাম পাবেন। এতে কৃষিপণ্য উৎপাদনেও আগ্রহ বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিলেটের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কৃষি খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। এ খাতে প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ সহজ করা গেলে লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়বে এবং কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি আরও সম্প্রসারিত হবে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ফাহিম আহমেদ চৌধূরী বলেন, কৃষি খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে। এতে সিলেটের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক ড. ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, সিলেট থেকে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো গেলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে, অন্যদিকে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন। এ জন্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে সিলেটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার তাগিদও দিয়েছেন তিনি।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮০ দশমিক ৪৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিলেটের কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণে সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।